প্রাণহিতা নদীর বুকে ছুটছে করমণ্ডল এক্সপ্রেস: ইতিহাস, প্রকৃতি ও গতির এক অনন্য যাত্রা
—শঙ্কর পাল
যখন করমণ্ডল এক্সপ্রেস ছুটে চলে প্রাণহিতা নদীর ওপর নির্মিত সেতু ধরে, তখন শুধু একটি ট্রেন পার হয় না—পার হয় এক যাত্রার ইতিহাস, এক নদীর কাহিনী, এবং মানুষের প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের প্রতিচ্ছবি।
প্রাণহিতা নদী: প্রকৃতি ও প্রাণের প্রবাহ
প্রাণহিতা নদী দক্ষিণ ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী, যা গডাবরী নদীর সর্ববৃহৎ উপনদী হিসেবেই পরিচিত। এই নদী জন্ম নিয়েছে ওয়ার্ধা ও ওয়েইঙ্গঙ্গা নদীর মিলনে, কৌঠালা, তেলেঙ্গানার কাছে। এটি প্রায় ১১৩ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে কেলেশ্বরমে গিয়ে গডাবরীতে মিশেছে।
এই নদীর জলাধার অত্যন্ত বিস্তৃত—প্রায় ১,০৯,০৭৮ বর্গকিলোমিটার, যা গডাবরী অববাহিকার ৩৪% কভার করে। মহারাষ্ট্র ও তেলেঙ্গানার বিস্তীর্ণ অংশ জুড়ে এই নদীর প্রবাহ দেখা যায়। পেঙ্গঙ্গা নদী সহ আরও অনেক উপনদীর জলধারা প্রাণহিতায় এসে মিশেছে।
নদীটি গডচিরোলি জেলা (মহারাষ্ট্র) এবং কোমরাম ভীম আসিফাবাদ জেলা (তেলেঙ্গানা)-র সীমান্ত বরাবর প্রবাহিত হয়। এই নদী ঐ অঞ্চলের কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও জনজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
করমণ্ডল এক্সপ্রেসের যাত্রা: নদী ও রেলের মিলন
প্রতিদিন শত শত যাত্রী করমণ্ডল এক্সপ্রেসে চেপে যাত্রা করেন চেন্নাই থেকে হাওড়া পর্যন্ত বিস্তৃত পথে। কিন্তু যারা প্রাণহিতা নদীর ওপর দিয়ে এই ট্রেনে যাতায়াত করেন, তাদের কাছে এই মুহূর্তটা যেন এক আলাদা আবেগ। নদীর ওপর তৈরি সেতু পেরিয়ে যাওয়ার সময় জানালার বাইরে তাকালে দেখা যায়—একদিকে শান্ত স্রোত, অন্যদিকে গতির উন্মাদনা।
স্থানীয় এক বাসিন্দা লক্ষ্মী তায়ারী বলেন, “নদীর ওপর দিয়ে যখন ট্রেনটা যায়, মনে হয় নদী আর ট্রেন একসঙ্গে কথা বলছে—একটা ছুটে চলে ভবিষ্যতের দিকে, আর একটা প্রবাহিত হয় ইতিহাস বয়ে।”
নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুদের চোখে করমণ্ডল মানে এক স্বপ্নের গাড়ি—যা নিয়ে যায় দূরের শহরে, যেখানে আলোর রঙ আরও উজ্জ্বল, ভবিষ্যৎ আরও বড়।
নদী ও রেল: এক উন্নয়নের উদাহরণ
এই দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়—উন্নয়ন আর প্রকৃতি একে অপরের শত্রু নয়, যদি তা হয় সহানুভূতির সঙ্গে পরিচালিত। করমণ্ডল এক্সপ্রেস ও প্রাণহিতা নদী একসঙ্গে প্রমাণ করে, গতি ও গভীরতা একসঙ্গে চলতে পারে।
প্রাণহিতা নদীর কথা আমরা ভুলে যাই, কিন্তু সে আমাদের ভুলে না।
তার বুক বেয়ে ছুটে চলা করমণ্ডল এক্সপ্রেস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—এই নদী কেবল জল নয়, এটি সময়, সংস্কৃতি ও জীবনের এক জীবন্ত প্রবাহ।
প্রাণহিতা বাঁচুক, ছুটে চলুক করমণ্ডল—প্রকৃতি ও মানুষের মিলনের অনন্ত পথে।